এক্সট্রিম ডায়েট বা না খেয়ে থাকা কতটা ক্ষতিকর?
বর্তমান সময়ে দ্রুত ওজন কমানোর প্রবণতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “৭ দিনে ৫ কেজি ওজন কমান”, “ডিটক্স ডায়েট”, “শুধু পানি খেয়ে থাকুন”, “একবেলা খান”, কিংবা “জিরো কার্ব ডায়েট” এ ধরনের অসংখ্য পরামর্শ প্রতিদিন মানুষের সামনে আসছে। অনেকেই মনে করেন, যত কম খাবেন তত দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এক্সট্রিম ডায়েট বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা (স্টাভেশন ডায়েট) ওজন কমানোর কার্যকর ও নিরাপদ উপায় নয়; বরং এটি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এক্সট্রিম ডায়েট বলতে কী বোঝায়?
এক্সট্রিম ডায়েট বলতে এমন খাদ্যাভ্যাসকে বোঝায় যেখানে শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম ক্যালোরি গ্রহণ করা হয় অথবা দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ না খেয়ে থাকা হয়। সাধারণত দৈনিক ৮০০–১০০০ ক্যালোরিরও কম খাদ্য গ্রহণ, কোনো একটি খাদ্যগোষ্ঠী পুরোপুরি বাদ দেওয়া, অথবা দীর্ঘ সময় উপবাস থেকে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা এসবই এক্সট্রিম-এর অন্তর্ভুক্ত।
শরীরে কী ঘটে যখন আমরা না খেয়ে থাকি?
শরীরের প্রধান জ্বালানি হলো গ্লুকোজ, যা আমরা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার থেকে পাই। দীর্ঘ সময় খাবার না খেলে শরীর প্রথমে লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে। এটি সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এরপর শরীর শক্তির জন্য চর্বি ভাঙতে শুরু করে।
এ পর্যায়ে অনেকেই ভাবেন, “চর্বি তো কমছেই!” কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত খাবার না পেলে শরীর শুধুমাত্র চর্বি নয়, পেশিও ভাঙতে শুরু করে। কারণ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সচল রাখতে প্রোটিনেরও প্রয়োজন হয়।
ফলে ওজন কমলেও তার একটি বড় অংশ আসে পেশি ও শরীরের পানি থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেয়।
বিপাকক্রিয়া কেন ধীর হয়ে যায়?
মানবদেহ অত্যন্ত বুদ্ধিমান। যখন শরীর বুঝতে পারে যে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যাচ্ছে না, তখন এটি শক্তি সঞ্চয়ের মোডে চলে যায়। একে এডাপ্টিভ থার্মোজেনেসিস বলা হয়।
- ফলে বেসাল মেটাবলিক রেট (বিএমআর) কমে যায়।
- শরীর কম ক্যালোরি খরচ করতে শুরু করে।
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা বাড়ে।
- ভবিষ্যতে স্বাভাবিক খাবার শুরু করলে দ্রুত ওজন বেড়ে যেতে পারে।
এ কারণেই এক্সট্রিম ডায়েট অনুসরণকারীদের মধ্যে পুনরায় ওজন বেড়ে যাওয়া খুবই সাধারণ।
পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি
এক্সট্রিম ডায়েট-এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি হলো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার না খেলে শরীরে ঘাটতি দেখা দিতে পারে—
- আয়রন
- ভিটামিন বি১২
- ভিটামিন ডি
- ক্যালসিয়াম
- জিঙ্ক
- ফোলেট
- অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি অ্যাসিড
এর ফলে হতে পারে
- রক্তশূন্যতা
- চুল পড়া
- ত্বকের সমস্যা
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
- হাড় দুর্বল হওয়া
- ক্ষত সারতে দেরি হওয়া
- ঘন ঘন সংক্রমণ
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং বয়স্কদের জন্য এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব
অত্যন্ত কম ক্যালোরিযুক্ত খাদ্য দীর্ঘদিন অনুসরণ করলে শরীরে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
ফলে দেখা দিতে পারে—
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
- নিম্ন রক্তচাপ
- মাথা ঘোরা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া
খুব দ্রুত ওজন কমানোর কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাও দেখা গেছে।
মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি
মস্তিষ্কের প্রধান জ্বালানি হলো গ্লুকোজ। দীর্ঘ সময় না খেলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত শক্তি পায় না
- ফলে হতে পারে
- মনোযোগ কমে যাওয়া
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া
- খিটখিটে মেজাজ
- উদ্বেগ
- হতাশা
- কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিয়ন্ত্রণের ফলে অনেকের মধ্যে খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে অতিরিক্ত খাওয়া-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন
এক্সট্রিম ডায়েট শরীরের বিভিন্ন হরমোনেও প্রভাব ফেলে।
নারীদের ক্ষেত্রে
- মাসিক অনিয়ম
- অ্যামেনোরিয়া(মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া)
- প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া
পুরুষদের ক্ষেত্রে
- টেস্টোস্টেরন কমে যেতে পারে
- যৌন আগ্রহ হ্রাস পেতে পারে
এছাড়া লেপ্টিন কমে এবং ঘ্রেলিন বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্ষুধা আরও বৃদ্ধি পায়, যা পরে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে।
পিত্তপাথর-এর ঝুঁকি
খুব দ্রুত ওজন কমালে পিত্তথলি ঠিকমতো সংকুচিত হয় না। ফলে পিত্ত জমে গিয়ে পিত্তপাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষ করে যারা অল্প সময়ে অনেক ওজন কমান, তাদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়
পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের অভাবে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায়।
ফলে সহজে ঠান্ডা-কাশি, সংক্রমণ ক্ষত সারতে দেরি, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, এসবের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
ওজন কমানোর সঠিক উপায় কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পুষ্টি ও পথ্যবিজ্ঞান একাডেমি এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর সুপারিশ অনুযায়ী নিরাপদ ওজন কমানোর জন্য
প্রতিদিন মাঝারি মাত্রার ক্যালোরি ঘাটতি (প্রায় ৫০০–৭৫০ ক্যালোরি) তৈরি করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত যাতে পেশি সংরক্ষিত থাকে। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর চর্বি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সপ্তাহে অন্তত ১৫০–৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম এবং সপ্তাহে অন্তত ২ দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৯ ঘণ্টা) ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও ওজন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গড়ে প্রতি সপ্তাহে ০.৫–১ কেজি ওজন কমানোকে নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ধরা হয়।
এক্সট্রিম ডায়েট হয়তো কয়েক দিনের জন্য ওজনের সংখ্যাটি কমিয়ে দিতে পারে, কিন্তু এটি সুস্বাস্থ্যের সমার্থক নয়। দ্রুত ওজন কমানোর পেছনে ছুটতে গিয়ে যদি শরীর পুষ্টিহীন, দুর্বল এবং বিপাকীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তবে সেই ওজন কমানোর কোনো বাস্তব সুফল থাকে না।
স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণ একটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনধারার পরিবর্তনের ফল, কোনো ক্ষণস্থায়ী খাদ্যনিয়ন্ত্রণের নয়। তাই না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত ক্যালোরি কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাসই হওয়া উচিত ওজন ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। প্রয়োজনে একজন নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
তথ্যসূত্র : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; পুষ্টি ও পথ্যবিজ্ঞান একাডেমি; আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে); হল কেডি. বিপাক এবং অভিযোজিত তাপোৎপাদন; মুলার এমজে প্রমুখ. মানুষের মধ্যে অভিযোজিত তাপোৎপাদন; অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা বিষয়ক এনআইসিই নির্দেশিকা।